Filled Under:

সূরা ইখলাস এর ফজিলাত


بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ
قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ
اللَّهُ الصَّمَدُ
لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ
وَلَمْ يَكُن لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ
অনুবাদ: ১। বলুন, তিনিই আল্লাহ একক (অদ্বিতীয়)। ২. আল্লাহ হচ্ছেন সামাদ (তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন, সকলেই তাঁর মুখাপেক্ষী। ৩. তিনি কাউকেও জন্ম দেননি এবং তাকেও জন্য দেয়া হয়নি ৪। এবং তাঁর সমতুল্য কেউ-ই নেই।

ফজিলাত কুরআনে কারীমের প্রতিটি সূরা, প্রতিটি আয়াত, এমনকি প্রতিটি হরফই নেকী ও সওয়াবের খাযানা, আল্লাহ তাআলার কালাম হিসাবে সবই অতুলনীয় মর্যাদার অধিকারী। তবে আল্লাহ তাআলা কোনো কোনো সূরা ও আয়াতের বিশেষ ফযীলত ও মর্যাদা ঘোষণা করেছেন। যাতে বান্দা বেশি থেকে বেশি সওয়াব অর্জন করতে পারে। এই বিশেষ ফযীলতের অধিকারী সূরা সমূহের অন্যতম হল সূরা ইখলাছ। হাদীস শরীফে এই সূরার অনেক ফযীলতের কথা বর্ণিত হয়েছে।

সূরা ইখলাছ কুরআন মাজীদের এক তৃতীয়াংশের সমান:

হাদীস শরীফে এসেছে, সূরা ইখলাছ কুরআন মাজীদের তিন ভাগের এক ভাগের সমান মর্যাদা রাখে। যে ব্যক্তি একবার সূরা ইখলাছ তিলাওয়াত করবে সে কুরআন মাজীদের তিন ভাগের একভাগ তেলাওয়াত করার সাওয়াব লাভ করবে। বিষয়টি বহু হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। এখানে কয়েকটি হাদীস পেশ করা হল।

আবু সাঈদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত-

أَن رَجُلًا شمع رَجُلًا يَقْرَأُ، قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ يُرْذِدْهَا فَلَنَا أَصْبَحَ جَاءَ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلِّ اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَذَكَرَ ذَلِكَ لَهُ وَكَانَ الرَّجُلَ يَتَقَالَهَا فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَى اللَّهُ عَلَيْهِ وسلم والذي نَفْسِي بِيَدِهِ إِنَّهَا لَتَعْدِلُ تُلْكَ القُرْآنِ

এক ব্যক্তি জনৈক সাহাবীকে দেখলেন, বারবার فن هُوَ اللهُ أَحَدٌ সূরাটি পড়ছেন। সকাল হলে ঐ ব্যক্তি রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে বিষয়টি পেশ করলেন। লোকটি হয়তো ভেবেছে, এ ছোট একটি সূরা বারংবার পড়তে থাকা তেমন সওয়াবের কাজ নয়- তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ঐ সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ। সূরা ইখলাছ কুরআনের এক তৃতীয়াংশের সমান। (সহীহ বুখারী, হাদীস ৫০১৩: সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১৪৬১: সুনানে নাসাঈ, হাদীস ৯৯৫)

আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- তোমরা সবাই জমা হও এবং অন্যদেরও জমা করো। আমি এখন তোমাদের সামনে কুরআন মাজীদের তিন ভাগের এক ভাগ তিলাওয়াত করে শোনাবো।

(নবীজীর এ ঘোষণা শুনে) অনেক সাহাবী জমায়েত হলেন। তখন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের হলেন এবং সূরা قُلْ هُوَ اللهُ أَحَدٌ তিলাওয়াত করলেন। এরপর হুজরার ভেতর চলে (আবু হুরায়রা রা. বলেন, তখন লোকেরা বলাবলি করতে লাগল, হয়তো নবীজীর নিকট আসমান থেকে কোনো খবর এসেছে। এজন্য (শুধু এই একটা সূরা পড়ে) তিনি ভেতরে চলে গেছেন। (আবার এসে এক তৃতীয়াংশ পড়বেন।) এরই মধ্যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের হলেন এবং বললেন-

إِنِّي تُلْتُ لَكُمْ سَأَقْرَأُ عَلَيْكُمْ ثُلُثَ الْقُرْآنِ أَلَّا إِنَّهَا تَعْدِلُ ثُلُثَ الْقُرْآنِ  
আমি তোমাদের বলেছিলাম, কুরআনের এক তৃতীয়াংশ পড়ে শোনাবো। তো শোনো, নিশ্চয় এই সূরা ইখলাছই হল কুরআনের এক তৃতীয়াংশের সমান। (সহীহ মুসলিম, হাদীস ৮১২; জামে তিরমিযী, হাদীস ২৯০০; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস প্রতি রাতে কুরআনের এক তৃতীয়াংশ তিলাওয়াত করা কি কঠিন?
আবু সাঈদ খুদরী রা. বলেন, নবীজী বলেছেন,

أَيْعْجِرُ أَحَدٌ لَمْ أَنْ يَقْرَ أَثُنْتَ القُرْآنِ فِي لَيْلَةٍ فَشَنَ ذَلِكَ عَلَيْهِمْ وَقَالُوا أَيُّنَا يُطِيقُ ذَلِكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ فَقَالَ اللهُ الوَاحِدُ الصَّمَدُ ثُلَّثُ القُرْآنِ
তোমাদের প্রত্যেকেই কি প্রতি রাতে কুরআনের এক তৃতীয়াংশ তিলাওয়াত করতে পারে না? বিষয়টি সাহাবীদের কাছে কঠিন মনে হয়েছে। তাই তারা বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের মধ্যে কে আছে, যে তা পারবে?
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, (আমলটি সহজ। কেননা,) সূরা ইখলাছই কুরআন মাজীদের এক তৃতীয়াংশ। (সহীহ বুখারী, হাদীস ৫০১৬: মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১১০৫৩) 
উক্ত হাদীসের প্রতি লক্ষ করে উলামায়ে কেরাম বলেছেন, রাতের বেলা সূরা ইখলাছ তিলাওয়াত করা মুস্তাহাব।


সূরা ইখলাস তিলাওয়াকারীকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়:
আবুল হাসান মুহাজির রাহ, বলেন, জনৈক সাহাবী বর্ণনা করেছেন, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে এক সফরে ছিলেন। (একদিন তাঁর কাছে এমনভাবে বসা ছিলেন যে,) তার হাঁটুদু'টি নবীজীর হাঁটুদ্বয়ের সঙ্গে লেগে ছিল।

فَسَمِعَ رَجُلًا يَقْرَأُ قُلْ يَأَيُّهَا الْكُفِرُونَ قَالَ بَرِئَ مِنَ الشَّرْلِ، وَسَمِعَ رَجُلًا يَقْرَأُ قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ قَالَ غُفِرَ لَهُ
এ অবস্থায় এক লোককে শুনলেন, সূরা কাফিরুন ভিলাওয়াত করছে। তা শুনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সে শিরক থেকে পবিত্র হয়ে গেছে। আরেক লোককে শুনলেন, সূরা ইখলাছ তিলাওয়াত করছে। তখন তিনি বললেন, তাকে মাফ করে দেওয়া হয়েছে। (সুনানে দারেমী, হাদীস ৪৩৬৯: মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২৩২০৬)
সূরা ইখলাছের মহব্বত তোমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে:
সূরা ইখলাছের সাথে মহব্বত ও আমলের সম্পর্ক এমনই ফযীলতের বিষয় যে, তা বান্দাকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করে জান্নাতে পৌঁছে দেয়। আনাস ইবনে মালেক রা. বলেন, জনৈক আনসারী সাহাবী মসজিদে কোবায় ইমামতি করতেন। তার অভ্যাস ছিল, সূরা ফাতিহার পরে অন্য সূরা মেলানোর আগে সূরা ইখলাছ পড়তেন, এরপর অন্য সূরা পড়তেন। প্রতি রাকাতেই তিনি এমন করতেন। তার সাথী-সঙ্গিরা আপত্তি জানালেন। তারা বললেন, আপনি প্রত্যেক রাকাতে সূরা ইখলাছ পড়েন, কিন্তু এই সরাকে যথেষ্ট মনে করেন না। বরং এর সাথে সূরা তিলাওয়াত করেন। আপনি হয় শুধু সূরা ইখলাছ পড়ুন, না হয় শুধু অন্য সূরা পড়ুন। (সূরা ফাতেহার পর প্রতি রাকাতে দুই সূরা পারবেনননা।) তিনি বললেন, এই সূরা আমি ছাড়তে পারব না এবং আমি নামায পড়লে এভাবেই পড়াব। তোমাদের পছন্দ হলে ইমামতি করব, না হয় ছেড়ে দেব।

সেই সাহাবী ছিলেন তাদের দৃষ্টিতে শ্রেষ্ঠ মানুষ। তাই অন্য কেউ ইমামতি করবে- এটা তারা পছন্দ করেননি। (তাই এভাবেই চলতে থাকল।)

একদিন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে কোবায় এলেন। তাঁর কাছে বিষয়টি উত্থাপন করা হল। নবী কারীম সাল্লাল্লাহ আলাইহি গুয়াসাল্লাম ঐ সাহাবীকে ডেকে বললেন-

يا فلان مَا يَسْتَعادَ أَنْ تَفْعَلَ مَا يَأْمُرُكَ بِهِ أَصْحَابُكَ

وما يخيلك عَلَى لُرُّومِ حَنِي وَالسَّورَةِ فِي كُلِّ وَالْعَةٍ
তোমার সাথীদের কথা মানতে বাধা কী? প্রতি রাকাতে আবশ্যিকভাবে সূরা ইখলাছ পড়ার কারণ কী?
সাহাবী উত্তর দিলেন إنِّي أجتها আমি সূরা ইখলাছকে মহব্বত করি। তার জবাব শুনে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-

حُبَكَ إِيَّاهَا أَدْخَلَكَ الجَنَّةَ
সূরা ইখলাছের প্রতি তোমার এই মহব্বত তোমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে।
(জামে তিরমিযী, হাদীস ২৯০১)

তার জন্য জান্নাত অবধারিত
আবু হুরায়রা রা. বলেন, আমি রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ছিলাম। এক বাক্তি ভিলাওয়াত করছিল-

قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ اللَّهُ الضَّيْدُ لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ وَلَمْ

يَكُن لَهُ كُفُوًا أَحَدٌ.
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুনে বললেন- ওয়াজিব হয়ে গেছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম- ماذا يا رسول কী ওয়াজিব হয়েছে। আল্লাহর রাসুল। তিনি বললেন- জান্নাত। (মুয়াত্তা মালেক, হাদীস ২৫৭)
তাকে জান্নাতের খোশখবরি দান করো: আনাস ইবনে মালেক রা. বলেন-আমি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে বসা ছিলাম। এক লোক এসে বলল, আমার এক ভাই এই সূরা (সূরা ইখলাছ) পড়তে ভালবাসে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার ভাইকে জান্নাতের সুসংবাদ দাও। (আলকামেল, ইবনে আদী ২/৩৯০: মুসনাদে বায্যার, হাদীস ৬৭৩১; ফাযায়েলে কুরআন, মুসতাগফিরী, হাদীস ১০৫০) স্বয়ং আল্লাহ যাকে মহব্বত করেন। তাআলার নৈকটা অর্জন, আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের
মহব্বত ও ভালবাসার নিআমত। যারা সূরা ইখলাছ বেশি বেশি পাঠ করে তাদের প্রতি আল্লাহ তাআলা রহমতের দৃষ্টি দেন এবং তারা আল্লাহ তাআলার প্রিয়পাত্র হয়ে যান। এর চেয়ে বড় সৌভাগ্য আর কী হতে পারে। এর থেকে বড় অর্জন আর কী থাকতে পারে। হযরত আয়েশা রা. বলেন-নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনৈক সাহাবীকে এক বাহিনীর আমীর নিযুক্ত করে যুদ্ধে প্রেরণ করেন। তিনি তাদের ইমামতি করতেন। যখনই কেরাত পড়া শেষ করতেন, সূরা قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ পড়তেন। ফিরে আসার পর তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট বিষয়টি আলোচনা করলেন। তিনি বললেন-

سَلُوهُ لِأَيِّ شَيْءٍ يَصْنَعُ ذَلِكَ
তাকে জিজ্ঞেস করো, সে এমন করে? সাহাবায়ে কেরাম তাকে করলে তিনি জবাব দিয়েছেন-لأَنهَا صِفَةُ الرَّحْمَنِ، وَأَنَا أُحِبْ أَنْ أَقْرَأَ بِهَا.
এই পূর্ণ সূরাটাই রহমানের ছিফাত ও গুণাবলির বিবরণ। তাই তা পড়তে আমি ভালবাসি। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জবাব শুনে সাহাবীদের বললেন-

أَخْبِرُوهُ أَنَّ اللَّهَ يُحِبْهُ
তাকে জানিয়ে দাও, আল্লাহও তাকে ভালবাসেন। (সহীহ বুখারী, হাদীস ৭৩৭৫; সহীহ মুসলিম, হাদীস ৮১৩)

যার জানাযায় সত্তর হাজার ফেরেশতা শরীক হয়েছেন হাদীস শরীফে এসেছে, মুআবিয়া ইবনে মুআবিয়া আলমুযানী আললাইছী রা. ইন্তেকাল করলে সত্তর হাজার ফেরেশতাসহ জিবরীল আলাইহিস সালাম নবীজীর কাছে আগমন করেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিবরীল আলাইহিস সালাম ও এইসব ফেরেশতাদের নিয়ে তার জানাযায় শরীক হন।
নামায শেষ হলে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন

يَا جِبْرِيلُ بِمَا بَلَغَ مُعَاوِيَةُ بْنُ مُعَاوِيَةَ الْمُزَنِي هَذِهِ الْمَنْزِلَةَ؟
হে জিবরীল! কোন্ আমলের মাধ্যমে মুআবিয়া ইবনে মুআবিয়া মুযানী এই উচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়েছে?

জিবরীল আলাইহিস সালাম জবাবে বলেছেন-

بِقِرَاءَةِ قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ قَائِمًا وَقَاعِدًا وَمَا شِيَّا وَرَاكِبًا. এই মর্যাদা লাভের কারণ হল, সে দাঁড়িয়ে, বসে, হেঁটেহেঁটে, সওয়ারীতে তথা সর্বাবস্থায় সূরা ইখলাছ তিলাওয়াত করত।
(মুজামে কাবীর ৮/১১৬, হাদীস ৭৫৩৭;)
এমন বহু ফজিলাত হাদীসে বর্ননা আছে, আল্লাহ পাক আমাদের সবাইকে সুরা ইখলাসের ফজিলাত প্রাপ্তির তাওফীক নসীব করুন। আমীন।