মাওলানা আব্দুল মতিন, সেক্রেটারী, ইসলামী সম্মেলন সংস্থা, বগুড়া, সভাপতি, জাতীয় ওলামা মাশায়েখ আইম্মা পরিষদ, বগুড়া জেলা,
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন অনেক কথার প্রতি বান্দাকে গুরুত্বপূর্ণ ভাবে দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য কসম খেয়েছেন। অনেক কথাই আল্লাহ তায়ালা কুরআনে কসম খেয়ে বলেছেন যেন কথার গুরুত্বটা বান্দার অন্তরে বদ্ধমূল হয়ে যায়। তবে আল্লাহ জন্য আল্লাহ তায়ালা ছাড়া অন্য কিছুর কসম খাওয়া নিষেধ নয়। বান্দার জন্য একমাত্র আল্লাহ তায়ালা ছাড়া অন্য কিছুর কসম খাওয়া হারাম। এই কথাটা অনেকের জানা না থাকায় অনেক মুসলমান আসমানের কসম খায়, জমিনের কসম খায়, বিদ্যা বৃদ্ধির কসম খায়, মাথার কসম খায়, মা-বাবার
কসম খায় এগুলো হারাম। বান্দা একমাত্র আল্লাহ তায়ালার নাম ছাড়া আর কারো নামে কসম খেতে পারে না। এ বিধান বান্দার জন্য আল্লাহ তায়ালার জনা নয়। আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন কোরআনে অনেক কথাই অনেক রকমের কসমের মাধ্যমে বলেছেন। তবে একটি কথা আল্লাহ তায়ালা এত বেশি কসম খেয়ে বলেছেন যে, আর কোন বিষয়ের কথা এত বেশি কসম খেয়ে বলেন নি। এর মানে হল এই বিষয়টা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সূরায়ে শামসের প্রথম থেকে আল্লাহ তায়ালা বেশ কতগুলো কসম খেয়ে এরশাদ করেন-
وَالشَّمْسِ وَضُحَاهَا وَالْقَمَرِ إِذَا ثَلَاهَا وَالنَّهَارِ إِذَا جَلَاهَا وَاللَّيْلِ إِذَا يَغْشَاهَا وَالسَّمَاءِ وَمَا بَنَاهَا وَالْأَرْضِ وَمَا طَحَاهَا وَنَفْسٍ وَمَا سَوَاهَا فَأَلْهَمَهَا فُجُورَهَا وَتَقْوَاهَا
অর্থ: আমি সূর্যের কসম খেয়ে বলছি, আমি রৌদ্রের কসম খেয়ে বলছি, আমি চন্দ্রের কসম খেয়ে বলছি, যখন তা সূর্যের পশ্চাতে আসে, দিনের কসম খেয়ে বলছি, দিনের আলোর কসম খেয়ে বলছি, রাতের কসম খেয়ে বলছি, রাতের অন্ধকারের কসম খেয়ে বলছি, আসমানের কসম খেয়ে বলছি, আসমান সৃষ্টি করার কসম খেয়ে বলছি, জমিনের কসম খেয়ে বলছি, জমিন কে সমতল করার কসম খেয়ে বলছি, আমি মানুষের মনের কসম খেয়ে বলছি, মনকে মানুষের উপযোগী করার কসম খেয়ে বলছি। এতগুলো কসম খেয়ে আল্লাহ তায়ালা একটি কথা বলেছেন, সে কথাটির মর্ম হলো,
فَأَلْهَمَهَا فُجُورَهَا وَتَقْوَاهَا قَدْ أَفْلَحَ مَنْ زَكَاهَا
وَقَدْ خَابَ مَنْ دَشَاهَا
যে মানুষ তার মনকে পবিত্র রাখে সে মানুষের জীবন সফল। আর যে মানুষ তার মনকে অপবিত্র করে রাখে তার জীবন বিফল। মানুষের জীবন সফল কীভাবে হয় আর বিফল কীভাবে হয়, এ কথাটা মহান আল্লাহ সূরায়ে শামসের শুরুতে ১৪টি কসম খেয়ে বলেছেন। আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল কারীমে এত কসম খেয়ে
আর কোন কথা বলেননি, শুধু মানুষের সফলতা আর বিফলতার কথা বলতে যত কসম খেয়েছেন। মানুষের মনের মধ্যে আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেকটা গুনাহের কাজের মজা বুঝার যোগ্যতা দান করেছেন। প্রত্যেকটা গুনাহের কাজের সাজা বুঝার যোগ্যতা দান করেছেন। এ দুটি বিষয় একত্রে না কোন জীবজন্তুকে আল্লাহ তায়ালা দান করেছেন। না কোন ফেরেশতা কে আল্লাহ তায়ালা দান করেছেন।
বিষয়টা পরিষ্কার হওয়ার জন্য আরেকটু খোলাখুলি বলি। যতকাজে গুনাহ হয় সবগুলো গুনাহের কাজে দুটি করে ফলাফল থাকে, একটি হলো গুনাহের মজা আরেকটি হলো গুনাহের সাজা। যেমন ধরেন- প্রশ্ন: বিয়ের আগে নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশা কি একটি সওয়াবের কাজ? উত্তর: না, গুনাহের কাজ। এর দুইটা ফলাফল আছে, একটি হলো মজা, অপরটি হলো, সাজা/শান্তি। এভাবে প্রতিটি গুনাহের কাজের দুটি করে ফলাফল আছে। একটি মজা আরেকটি সাজা। গুনাহের কাজের সাজা ফেরেশতারা বুঝে কিন্তু মজা বুঝে না। আর গুনাহের কাজের মজা জানোয়ার বুঝে কিন্তু সাজা বুঝে না। নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশার মধ্যে কি মজা? এমন মজা জানোয়ারও বুঝে। কিন্তু এমন মিলামিশার কারণে পরকালে কি সাজা হবে? এটা বুঝার যোগ্যতাই কোন জানোয়ারের নাই। এর সম্পূর্ণ বিপরীতে, বিয়ে ছাড়া নারী পুরুষের মিলামিশার সাজা পরকালে কি হবে তা ফেরেশতারা ভালই জানে, কিন্তু কোন মজায় মানুষ এ পাপটা করে তা তারা বুঝে না। শুধু মজাটা বুঝে জানোয়ারে, শুধু সাজাটা বুঝে ফেরেশতা, আর আল্লাহ তায়ালা বলেন, মানুষ দুটোই বুঝে। ০১. মানব শ্রেষ্ঠত্বের রহস্য ফেরেশতা যেহেতু মজা বুঝেনা, এজন্য ফেরেশতা আজীবন বেগুনাহ থাকা সত্বেও সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মর্যাদার অধিকারী হতে পারে না। কারণ যে গুনাহের মজা বুঝেনা সে থেকে বিরত থাকলেও পুরষ্কারের যোগ্য হয় না। আর জানোয়ার যেহেতু সাজা বুঝে না, এজন্য জানোয়ার জীবনভর বিয়ে ছাড়া নর-মাদী মিলনে লিপ্ত হওয়া সত্বেও পরকালে এরা আহান্নামে
যাবে না। যেহেতু সাজা বুঝার যোগ্যতা নেই, এজন্য সাজা হবে না। ফেরেশতার যেহেতু মজা বুঝার যোগ্যতা নেই এজন্য ফেরেশতা গুনাহ থেকে বিরত থাকলেও শ্রেষ্ঠ মর্যাদার অধিকারী হবে না। আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন মানুষকে প্রতিটি গুনাহের মজা বুঝারও যোগ্যতা দান করেছেন, সাজা বুঝারও যোগ্যতা দান করেছেন, এখানে হবে মানুষের পরীক্ষা। তুমি মজার লোভে গুনাহে লিপ্ত হও, না সাজার ভয়ে গুনাহ ছেড়ে দাও। কোন মানুষ যদি মজার লোভে গুনাহে লিপ্ত হয় তখন তার আত্মাটা অপবিত্র হয়ে যায়। সেই আত্মাটা তখন জাহান্নামের শাস্তির যোগ্য হয়ে যায়। আর কোন মানুষ যদি ভয়ঙ্কর জাহান্নামের শান্তির ভয়ে শুনাহের অভ্যাস যথারীতি তওবা করে ছেড়ে দেয় তাহলে ঐ মানুষের আত্মা আবার পাক পবিত্র হয়ে যায়। সেই লোকটা জান্নাতের উপযুক্ত হয়ে যায়। প্রাথমিক দিকের এই কথাগুলো মনে রাখলে পরের কথাগুলো বুঝতে সহজ হবে। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে যেমনিভাবে গুনাহের মজা বুঝার যোগ্যতা দান করেছেন, তেমনিভাবে গুনাহের সাজা বুঝার যোগ্যতাও দান করেছেন, সুতারাং যোগ্যতার বিচারে মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ। ফেরেশতার একটি যোগ্যতা আছে অন্যটা নাই, জানোয়ারের অন্য যোগ্যতা তো আছে, অপরটা নাই। কেবলমাত্র মানুষের ফেরেশতাদের যোগ্যতাটাও আছে, জানোয়ারের যোগ্যতাটাও আছে। বুঝা গেল
যোগ্যতার বিচারে মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ। فَأَلْهَمَهَا فُجُورَهَا وَتَقْوَاهَا قَدْ أَفْلَحَ مَنْ زَكَّاهَا. وَقَدْ خَابَ مَنْ دَشَاهَا
কোন মানুষ যখন মজার লোভে গুনাহে লিপ্ত হয় তখন তার আত্মাটা বা মন নাপাক/অপবিত্র হয়ে যায় এই মানুষটাই যখন আল্লাহ তায়ালার ভয়ে অথবা জাহান্নামের শাস্তির ভয়ে যথারীতি তওবা করে গুনাহ ছেড়ে দেয়, তখন সে বেগুনাহ হয়ে যায়। হাদিস শরীফে আল্লাহ তায়ালার রাসুল ও বলেন, التَّائِبُ مِنَ الذَّنْبِ كَمَنْ لَا ذَنْبَ لَهُ
যে গুনাহগার যথারিতী তওবা করে গুনাহ ছেড়ে দেয় আল্লাহ তায়ালা তাকে আবার বেগুনাহ বানিয়ে দেয়। ০২. অপবিত্র মনকে পবিত্র করার চমৎকার কুরআনী চিকিৎসা উক্ত আয়াতে বলা হয়েছে। মানুষের মনের মধ্যে গুনাহের প্রতি সদা সর্বদা লোভ লালসা বিদ্যমান থাকে, এ কারণে মন থেকে গুনাহের মজার লালসা বেরও করতে পারে না, আর তওবা করা তার নসীবও হয় না। গুনাহের মজার লালসা মানুষের অন্তরে থাকার কারণে, হয়তো তওবা নসীব হয় না আর না হয় আগের দিন তওবা করলেও পরের দিন আরো ১০ বার গুনাহ করে। তওবা যখন করেছিলো তখন সাজার ভয় অন্তরে ঢুকেছিলো আবার যখন মজার লোভটা তার অন্তরে বড় আকার ধারণ করেছে তখন সে আবার তওবা ভঙ্গ করে আবার গুনাহে লিপ্ত হয়েছে। প্রশ্ন: একবার তওবা করলেও আবার ১০ বার গুনাহ করে কেন?? উত্তর: গুনাহের মজার লোভতার অন্তরে সবসময় বিদ্যমান থাকে। তাহলে এ তওবাটাতো গুনাহগারের সফলতা বয়ে আনতে পারল না। গুনাহের মজার লোভে হয়তো তওবাই করতে পারে না আর হয় তওবার উপর অটল থাকতে গারে না। গুনাহের মজার লোভের এ দুইটা পরিণতি (১) হয়তো তওবা করতেই পারে না আর না হয় (২) তওবা করলেও তার উপর অটল থাকতে পারে না। প্রশ্ন: সুতরাং সফল তওবা, অর্থাৎ তওবা করার জন্য অনুপ্রাণিত হওয়া এবং তওবার উপর অটল থাকার ব্যবস্থা কি? উত্তর: আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন সেই ব্যবস্থা বলে দিয়ে কুরআনে বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ আল্লাহ তায়ালার শাস্তির ভয় অন্তরে রাখো, আল্লাহ
তায়ালার শাস্তির ভয় অন্তরে রাখলে গুনাহ করার সাহস থাকবে না আল্লাহ তায়ালার শান্তির ভয় অন্তরে বদ্ধমূল হবে না আল্লাহ ওয়ালাদের সংশ্রব অবলম্বন করলে। আল্লাহ ওয়ালাদের সোহবতে থাকলে, আল্লাহ কাছে বসা থাকলেও মনের মধ্যে আল্লাহ তায়ালার ভয় জাগ্রত হতে থাকে।
০৩ জীবনের সব গুনাহ মুছে ফেলার উপায় আল্লাহ তায়ালা কুরআনের মধ্যে আখেরী জামানার নবীকে তাঁর উম্মতের হেদায়েতের জন্য যে ৪টি পন্থা বলে দিয়েছেন তার মধ্যে চতুর্থ ও সর্বশেষ হল উম্মতের আত্মা পবিত্র করে দেয়া। প্রশ্ন: গুনাহ করতে থাকলে আত্মা পবিত্র হয়? না তওবা করে গুনাহ ছেড়ে দিলে আত্মা পবিত্র হয়? উত্তর: তওবা করে গুনাহ ছেড়ে দিলে আত্মা/মন পবিত্র হয়। আমাদের সমাজে অনেক মুসলমান এমনও আছেন যারা তওবার মর্মও বুঝেন না, তওবার অর্থও বুঝেন না। এরা শুধু তওবা, তওবা জপাকেই তওবা মনে করে অথচ মুফাস্সিরীনে কেরাম তফসীরের কিতাবে লেখেছেন, ৬ কাজের সমষ্টির নাম তওবা। প্রশ্ন: কত কাজের সমষ্টির নাম তওবা? উত্তর: ৬ কাজের সমষ্টির নাম তওবা। প্রশ্ন: কত ফরজ পালন করলে ওজু হয়?? উত্তর: চার ফরজ। এক ফরজ মুখ ধোয়া, দ্বিতীয় ফরজ হাত ধোয়া, তৃতীয় ফরজ মাথা মাসেহ করা, চতুর্থ ফরজ পা ধোয়া। প্রশ্ন: কত ফরজে ওযু হয়? উত্তর: ৪ ফরজে ওযু হয়।।
কেউ যদি মুখ ধুইলো, হাত ধুইলো, মাথা মাসেহ করল কিন্তু পা ধুইল না তার যেমন ওজু হলো না। ঠিক তেমনিভাবে ৬ কাজ একসাথে করলে তওবা হয়, কেউ ৫ কাজ করল বাকি ১ কাজ করল না তার তওবা হলো না। ৪ ফরজ আদায় করা ছাড়া যেমনিভাবে ওজু হয় না, তেমনিভাবে ৬ কাজ না করা পর্যন্ত তওবা হয়না। হযরত আলী (রাঃ) কে জিজ্ঞাসা করা হল: তওবা কি? তিনি বললেনঃ ছয়টি বিষয়ের একত্রে সমাবেশ হলে তওবা হবে- ০১ নম্বর: অতীত মন্দকর্মের জন্য অনুতাপ ০২ নম্বর: যেসব ফরজ ও ওয়াজিব কর্ম তরক করা হয়েছে সেগুলো কাযা করা ০৩ নম্বর: কারও ধন-সম্পদ ইত্যাদি অন্যায়ভাবে কাউকে হাতে অথবা মুখে দিয়ে থাকলে তজ্জন্যে ক্ষমা নেয়া ০৫ নম্বরঃ ভবিষ্যতে সেই গোনাহের কাছে না যাওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় সংকল্প হওয়া এবং ০৬ নম্বর:
নিজেকে যেমন আল্লাহ তায়ালার নাফরমানী করতে দেখেছিল, তেমনি আনুগত্য করতে দেখা।
- (মাযহারী) এ ৬ কাজ যে করে নবীজী বলেন,
التَّائِبُ مِنَ الذَّنْبِ كَمَنْ لَا ذَنْبَ لَهُ
গুনাহ করে আত্মাটা নাপাক করেছিল, এখন ৬ কাজের মাধ্যমে তওবা করেছে, তার গুনাহ তার আমলনামা থেকে মুছে ফেলা হয়েছে, তার অপবিত্র আত্তাটা আবার পবিত্র হয়ে গেছে, আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কবুল করুন, আমীন