Filled Under:

যার আমানতদারী নেই তার ঈমান নেই

                                                 যার আমানতদারী নেই তার ঈমান নেই

হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনেক হাদিস থেকে একটি হাদিস যার অর্থ: ঈমানদার তারাই যারা আমানতের হেফাজত করে। হাদিসের অর্থ: যার মধ্যে আমানতদারী নেই তার ঈমান নাই।


আমানতের অর্থ ও প্রকারভেদ: কোন ব্যক্তির উপর আস্থা বিশ্বাস রেখে তার নিকট কোন বস্তু গচ্ছিত রাখাকে আমানত বলা হয়।


আমানত দুই প্রকার: এক, সম্পদের আমানত। দুই. কথার আমানত। কারো উপর পূর্ণ আস্থা রেখে কোন সম্পদ তার রাখা; এটা সম্পদের আমানত।


কোন ব্যক্তির সাথে জরুরী কোন কথা বলার পর সে আপন গন্তব্যের দিকে ফিরে যাওয়ার সময় তার প্রতি তাকানো প্রমান করে তাকে যে কথাটা বলা হয়েছে, তা তার নিকট আমানত রাখা হয়েছে। এটা কথার আমানত। বর্তমান সম্পদের আমানত কিছুটা থাকলেও কথার আমানত নেই বললেও চলে। কথার যে অংশটি তার স্বার্থের বিপরিত হলে, তা বাদ দিয়ে অথবা অতিরঞ্জিত করে অন্যকে বলে। আমানতের উভয় প্রকার নিয়ে বর্তমান মুসলমানদের মধ্যে কোন গুরুত্বই নেই। অথচ কুরআন হাদীসের কোথাও বলা শুধু আমানতদারীর বিষয়ে কঠোর ঘোষণা দেয়া REHTI তার ঈমান নেই। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু এ ঘোষণা দিয়ে দায় মুক্ত হননি, বরং মুনাফিক হিসেবে  আখ্যায়িত করা হয়। তখন আরবের প্রত্যেক লোকের কাছে হুজুর সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমানতদার, ন্যায়নীতি ইত্যাদির দিক থেকে ভক্তি শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। নবুওয়াত প্রাপ্তির পর ছাফা পর্বতে দাঁড়িয়ে আহ্বান করলেন, হে মক্কাবাসী। যদি ইহকাল ও পরকালে শান্তি পেতে চাও মূর্তিপূজা ছেড়ে দিয়ে এক আল্লাহর উপর ঈমান নিয়ে আসো। তখন গুটি কয়েক ঈমানদার ব্যতিত পুরা মক্কাবাসী আল্লাহর হাবিবের দুশমন হয়ে গেল। তাঁর বিরুদ্ধে এমন কোন ষড়যন্ত্র বাদ রাখেনি, যা তারা করেনি। কিন্তু হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা আবু তালেব কাবা শরীফের মুতাওয়াল্লী কুরাইশদের সর্দার বা নেতা ভাতিজা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। একারনে মুশরিকগণ হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার সাহস করেনি। তার এবং হযরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহার ইন্তেকালের পর মুশরিকদের ষড়যন্ত্র বেড়ে গেল।



অবশেষে তারা হুজুর সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দুনিয়া থেকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করার জন্য দারুন নদওয়া নামক একটি হলের রুদ্ধদ্বার কক্ষে গভীর রাত্রে গোপন পরামর্শে বসল। ইবলিস পরনে জুব্বা, মাথায় পাগড়ী, হাতে লাঠি নিয়ে পীরের বেশে কক্ষের নিকট গিয়ে আওয়াজ দিল, দরজা খোল। ইবলিস কক্ষের ছিদ্র দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করার ক্ষমতা রাখার পরও মানুষের বেশে আসার উদ্দেশ্য, তাদের সাথে পরামর্শে শরীক হওয়া। ভিতর থেকে আবু জেহেল জানতে চাইল, তুমি কে? কেন এসেছ? জবাবে ইবলিস বলল, আমি নজদ শহরের একজন পীর সাহেব। তোমাদের সাথে পরামর্শে শরিক হতে এসেছি। আবু জেহেল বলল, গুরুত্বপূর্ণ একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহন করার জন্য আমরা এখানে একত্রিত হয়েছি। পীর দরবেশর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত ও পরামর্শ দেওয়ার যোগ্যতা রাখেনা। যেদিক থেকে এসেছেন ঐ দিকে চলে যান।


ওলামায়ে কেরাম, পীর-মাশায়েখগণ রাজনীতি বুঝে না এবং বাজনীতির সিদ্ধান্ত দেওয়ার যোগ্যতা রাখেনা। সুতরাং পীর-মাশায়েখগণ রাজনীতি বুঝেনা পীর হলে রাজনীতি করা যায় না- এ উক্তি আবু জেহেলের। ইবলিস আবার বলল, দরজা খোল। তোমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু আমার জানা আছে। আবু জেহেল আমাদের আলোচ্য বিষয় সম্পর্কে আপনার কী জানা আছে? ইবলিস বলল, আল্লাহর নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে নিয়ে কি করা যায়। তার ব্যাপারে তোমাদের চেয়ে আমার মাথা ব্যাথা বেশি আছে। আমি তোমাদেরকে তার ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত প্রদান করব। তোমাদের তো জোশ আছে হুঁশ নাই, উগ্রতা আছে বুদ্ধিমত্তা নাই। তার কথা শুনে আবু জেহেল অবাক। গভীর রজনী, গোপান কক্ষ আলোচনা বিষয় বস্তু গোপন রাখা হয়েছে অথচ সে নজদ দেশ থেকে আমাদের এই বিষয়গুলো কিভাবে জানতে পারল। তাড়াতাড়ি দরজা খুলে দিল। ইবলিস ভেতরে প্রবেশ করল। তার চেহারায় বুদ্ধির দীপ্তি দেখা যাচ্ছে। তাই সবাই তাকে সভাপতির আসনে বসিয়ে দিল। তার সভাপতিত্বে

তাদের পরামর্শ সভা নেহায়াত গোপনীয়তা রক্ষা করে শুরু করলো। পরামর্শ সভায় ৩টি প্রস্তাব আসলো। তন্মধ্যে ২টি নাকড হয়ে গেল। একটির উপর সবাই একমত। আলিমুল গায়েন আল্লাহ ওহীর মাধ্যমে তাদের ৩টি প্রস্তাব মানুষের সামনে প্রকাশ করে দিয়েছেন।


আল্লাহ ইরশাদ করেন:َ

অর্থ। আর কাফিরগণ যখন প্রতারনা করত স্থাপনাকে বন্দি অথবা হত্যা করার উদ্দেশ্যে কিংবা আপনাকে বের করে দেওয়ার জন্য। তখন তারা যেমন ষড়যন্ত্র করে তেমনি অম্লাহও (তাঁর নবীকে বাঁচানোর) কৌশল অবলম্বন করেন। বস্তুত। আল্লাহর কৌশল সর্বশ্রেষ্ঠ। (সুরা আনফাল, আয়াত। ৩০) 

তাদের প্রথম প্রস্তাব মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে। খাদ্য-পানি কিছু না দিয়ে তাঁকে তিলে তিলে বিনাশ করে দিতে হবে। ইবলিস বলল, এই প্রস্তাব ফলপ্রসু হবে না। কারণ এর পূর্বে তাকে শিয়াবে আবু তালেবে বন্দি করে রেখেছিল। তাঁর প্রভু তাঁর জন্য খানা-পিনার ব্যবস্থা করেছিল। সুতরাং এই প্রস্তাব বাতিল করা হউক। সবাই একমত। দ্বিতীয় প্রস্তাব তার নাগরিকত্ব বাতিল করে মক্কা থেকে বের করে দিতে হবে। ইবলিস বলল, এটাও বাদ। কারণ, এখন তো সেই তোমাদের কাছে আছে, নির্বাসিত হলে সেখানে বিভিন্ন স্থান থেকে লোকজন তাঁর আদর্শে দিক্ষিত হয়ে বিরাট জামায়াতে পরিনত হবে। তখন তাঁরা দলবল নিয়ে তোমাদের উপর আক্রমন করে তোমাদেরকে নিশ্চিহ্ন করে দিবে। তৃতীয় প্রস্তাবে আবু জেহেল বলল, তাকে জবাই করে হত্যা করব। ইবলিস বলল, এটাই আসল সিদ্ধ্যন্ত এবং বুদ্ধিমত্তার কাজ, এই বলে ইবলিস হাতে তালি দিল। কোন প্রস্থাব পাশ হলে হাতে তালি দেয়া এটার প্রথম প্রবক্তা ইবলিস। মুসলমানরা বর্তমান ইবলিসের এ তরিকাকে অনুসরণ করে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহন করার পর হাতে তালি দেয়।


এটা ইসলামী কালচার নয়। যাই হোক, এই প্রস্তাব পাশ হওয়ার পর ইবলিস বলল এটা কার্যকর করবে কিভাবে? আমি এ ব্যাপারে উত্তম পরামর্শ দিচ্ছি, তাকে হত্যা করার জন্য একাকি কেহ যাবেনা। এতে হিতে বিপরীত হবে এবং সে তার মুরিদ হয়ে যাবে। যেমন খাত্তাবের বেটা ওমর একাকি তাকে হত্যা করতে গিয়ে তার দলভুক্ত হয়ে গেছে। উপরন্ত একাকি যদি কেহ খুন করে, তাহলে বনি হাশেমের গোত্র সে খুনির কেছাছ বাং বদলা নেবে। সুতরাং একা না গিয়ে পুরা আরবের ১২ গোত্র থেকে দুইজন করে মোট চব্বিশ জন যুবক তৈরী হও। কিছুক্ষন আগে আমি দেখে এসেছি সে অমুক ঘরে শুয়ে আছে। সুতরাং চব্বিশ জন যুবক খোলা তরবারী নিয়ে এখনই গিয়ে তাকে হত্যা করে আস। দেরী করো না। কারণ দেরী করলে তার খোদা তাকে নিরাপদে বাঁচিয়ে রাখবে। ইবলিস এখানে ভুল করেছে এবং বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে যে, দেরী করলে তাঁর খোদা তাকে বাঁচাতে পারে। দেরী না করলেও তাকে বাঁচাতে সক্ষম। ইবলিসের পরামর্শে চব্বিশ জন যুবক চব্বিশটি খোলা তরবারী নিয়ে আল্লাহর হাবিবকে জবেহ করে হত্যার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হল (নাউজুবিল্লাহ)। ফেরেশতাকুলর সরদার হজরত জিবরাইল (আঃ) তড়িত গতিতে হাজির হয়ে আল্লাহর হাবিবকে ডেকে বললেন, ওগো আল্লাহর হাবিব মক্কার চব্বিশ জন যুবক আপনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে মিলিত হয়েছে। সুতরাং আপনি এখনই এ জায়গা ছেড়ে সুদূর মদীনার দিকে হিজরত করেন। এই ঘটনায় তিনি একটু বিপাকে পড়ে ভাবলেন, মক্কার লোকদের আমানত আমার নিকট গচ্ছিত আছে। আমি যদি হঠাৎ চলে যাই এই আমানত প্রকৃত মালিকদের কাছে কে পৌছিয়ে দেবে? এবং এদের কি অবস্থা হবে? আমি তো উম্মতগণকে খেতাব করে বলেছি, যার আমানতদারী নেই তার ঈমান নাই। কি তায়াজ্জবের বিষয়? যারা তাঁকে হত্যার জন্য এগিয়ে আসছে আর তিনি তাদের আমানতের মাল রক্ষা করার জন্য অস্থির। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাড়াতাড়ি ১৮/১৯ বছরের যুবক হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু তায়ালা


আনছকে ডেকে বললেন, ভাই আলী। কাফিরদের এই সিদ্ধান্ত আর আল্লাহর নির্দেশ এখনই আমাকে মদীনার দিকে রওয়ানা হওয়া। অতএব এই আমানতের দায়িত্ব তোমায় নিকট সোপর্দ করলাম। এটা অমুকের আমানত, এটা অমুকের মাল ইত্যাদি। সুতরাং তুমি এই আমানত আমানতদারের নিকট পৌছে দিয়ে মদীনায় রওয়ানা করবে। যদিও আমি আপাতত তোমাকে রেখে যাচ্ছি, আমি ওয়াদা করছি আমি মদীনার কাছে অবস্থান করব তুমি আসলে তোমাকে নিয়ে মদীনার প্রবেশ করব। হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বললেন, ওগো আল্লাহর হাবিব। আপনার এ আদেশ অমান্য করার সাহস আমার নাই। দয়া করে আপনার কম্বলটি আমাকে দিন, আমি সেটা মুড়িয়ে আপনার বিছানায় শুয়ে থাকব। মক্কার যুবকরা এসে আপনাকে না পেয়ে হয়ত আমাকে হত্যা করবে, এতে আমার কোন আফসোস নেই। কিন্তু আমার অন্তরে দুঃখ একটাই, আপনাকে না পেয়ে তারা দৃঢ় ধারনা পোষণ করবে যে, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মদীনার দিকে রওয়া হয়েছেন। তখন তারা আপনার তালাশে বের হয়ে যাবে। হয়ত কোন এক জায়গায় আপনাকে শহীদ করে দিবে। আপন চোখে আপনাকে আর দেখব না-এটাই আমার অন্তবের বেদনা।


এদিকে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘর থেকে বের হয়ে সোজা হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুর বাড়ি গেলেন। আস্তে করে তাঁকে ডাক দিলেন, আবু কুহাফার ছেলে আবু বকর সিদ্দিক। ডাকের সাথে সাথে তিনি সফরের প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র নিয়ে হুজুর সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে উপস্থিত। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবাক হয়ে গেলেন। মনে মনে বললেন, আমাকে এখনই হিজরত করে মদিনায় যেতে হবে: এই বিষয়টি কয়েক মিনিট আগেও তো আমি জানতাম না। হযরত জিবরাইল আলাইহিস সালাম এসে বলার পর আমি হিজরতের জন্য বের হলাম। অথচ আবু বকর তো আগে থেকেই প্রস্তুত হয়ে রয়েছে। হযরত জিবরাইল আলাইহিস



সালাম তাঁকে বলেছে নাকি। হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হজুর সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামের মনের ভাব বুঝতে পেরে বললেন, ওগো আল্লাহর হাবিব। আবু বকরের মত এত নগন্য লোকের কাছে হযরত জিবরাইল আলাইহিস সালাম আসবে না, তারপরও আমার এই প্রস্তুতি। কারণ এক বছর পূর্বে একদিন আপনি আমাকে কথার ছলে বলেছিলেন, আবু বকর। মনে হয় আমরা মক্কায় থাকতে পারব না। সুতরাং যখন যেখানে যাই তোমাকে আমার সঙ্গে যেতে হবে। আমি বিশ্বাস করি, একথা পয়গম্বরী জবানের কথা। এ জবান থেকে যা বের হবে, তা একদিন অবশ্যই বাস্তবে রুপান্তরিত হবে। ঐদিন থেকে আজ একটি বছর আরামের ঘুম হারাম করে আমি প্রস্তুত হয়ে আছি।


কারণ জানি না, কোন মুহূর্তে আপনি আমাকে ডাক দিবেন। সাড়া দিতে যদি বিলম্ব হয় আর আল্লাহ যদি নারাজ হয়ে আমাকে বলে, হে আবু বকর। তুমি আমার হাবিবের ডাকে সাড়া দিতে বিলম্ব করেছ, সুতরাং তুমি তাঁর সঙ্গী হওয়ার যোগ্য নও। তখন তো আবু বকরের কোন উপায় থাকবে না।


কথা শেষ করে তিনি হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে উটের উপর বসিয়ে নিজে পিছনে বসে এক গ্রাম্য রাস্তা দিয়ে (যে রাস্তা দিয়ে সাধারনত: মানুষজন চলাফেরা করেনা। মদিনার দিকে রওয়ানা করলেন।


আবুজেহেল বলল, হে আব্দুল্লাহর ছেলে মুহাম্মাদ। তোমার আর সময় বাকী নেই। কম্বল সরিয়ে দেখে, এটা তো মুহাম্মাদ নয়। এ তো আমাদের সর্দার আবু তালেবের ছেলে আলী। আবু জেহেলের রক্ত মাথায় উঠলো। ক্ষিপ্ত হয়ে চোখ লাল করে বলল, হে আলী। বল,


তোমার ভাই মুহাম্মাদ কোথায়? হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন, কথার পন্ডিত। তিনি বললেন, আশ্চর্যের কথা। তাঁকে তালাশ করছ তোমরা আর জিজ্ঞাসা করছ আমাকে? এখন তোমরাই বল, আমার ভাইকে কি করেছ? আবু জেহেল কোন কথা না বলে সোজা আবু বকর সিদ্দিক বাদিয়াল্লাহু আনহুর বাড়ির দিকে রওয়ানা হল। গিয়ে দেখল, ঘরের দরজা খোলা আছে। স্ত্রীর স্বরে আবু জেহেল ডাক দিল, আবু কুহাফার ছেলে আবু বকর বের হও। সিদ্দিকে আকবর রাদিয়াল্লাহু আনহুর বড় মেয়ে সাইয়্যেদিনা হযরত আছমা রাদিয়াল্লাহু আনহা ঘর থেকে বের হলেন। আবু জেহেল জিজ্ঞেস করল, তোমার বাবা কোথায়? হযরত আছমা রাদিয়াল্লাহু আনহা উত্তর দিলেন, বলতে পারবনা। একথা বলেননি, আমি জানি না। অর্থাৎ জানলেও তোমাদের কাছে বলা যাবে। না। কমবখত আবু জেহেল হযরত আছমা বাদিয়াল্লাহু আনহাকে এমন জোরে চড় মারল যে, সঙ্গে সঙ্গে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। ইসলামের ইতিহাসে কোন মহিলা সাহাবীর নির্যাতিতা হওয়ার এটাই প্রথম ঘটনা। অতপর আবু জেহেল আদেশ দিল, চারিদিকে তালাশ কর। মদিনার রাস্তা দেখ। ঘোষণা দিল, যে ব্যক্তি তাঁকে জীবিত অথবা মৃত এনে দিতে পারবে, তাকে উত্তম পুরস্কার প্রদান করা হবে।


এদিকে সিদ্দিকে আকবর রাদিয়াল্লাহু আনহু গ্রামের আঁকা-বাঁকা পথ দিয়ে মদিনার দিকে রওয়ানা হলেন। ঘটনাচক্রে একদল ব্যবসায়ীর সামনে পড়ে গেলেন। তারা সবাই মুশরিক। হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহ আনহুকে চিনে, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে চিনে না। তারা জিজ্ঞেস করল, আবু বকর। তোমার সাথে লোকটা কে? এতে তিনি মহা বিপাকে পড়ে গেলেন। কারণ সত্য বললে নবী ধরা পড়ে। আর অসত্য বললে তিনি সিদ্দিক (সত্যবাদী)

 তিনি তো জীবনে কোনদিন মিথ্যা বলেননি, বলতে পারেন না। এমন কঠিন মুহূর্তে আল্লাহ তাঁর মুখ থেকে বের করে দিলেন, هو رحل پدبي السنيل অর্থাৎ তিনি এমন একজন মানুষ যিনি আমাকে রাস্তা দেখান। কাফেররা বুঝলো, আবু বকরা গ্রাম্য রাস্তা চিনেন না, তাই গ্রাম থেকে একজন লোককে নিয়ে এসেছে তাকে রাস্তা দেখানোর জন্য।আর সিদ্দিকে আকবর রাদিয়াল্লাহু আনহুর উদ্দেশ্য হল, তিনি এমন মানুষ যিনি আমাকে আখেরাতের রাস্তা দেখান।এখান থেকে উভয়ে দূর পর্বতের গুহায় গেলেন। রাত প্রায় শেষ। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমরা আপাতত: এই গুহায় অবস্থান করি।


অত:পর সিদ্দিকে আকবর রাদিয়াল্লাহু আনহুর কোলে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুমিয়ে পড়লেন।

এই বিষয়ে অনেক লম্বা আলোচনা আছে, যা আপনারা বিভিন্ন আলেমগণের মুখ থেকে শুনেছেন। তার একটি

সংক্ষিপ্ত কথা যা আল্লামা ইবনে হজর আসকালানী রহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেছেন। সিদ্দিকে আকবর রাদিয়াল্লাহু আনহুর কোলে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাথা মোবারক। মনে হয় যেন আল্লাহর কুরআন রেহালের মধ্যে আরাম করছেন। অর্থাৎ হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবন্ত কুরআন আর সিদ্দিকে আকবর রাদিয়াল্লাহু আনহুর কোল রেহাল।


শীয়াদের ঈমান বিধ্বংসী যুক্তি ও তার জবাব: ইরানী রাষ্ট্রের শীয়ারা কাফের, এতে যারা সন্দেহ করবে তারাও কাফের। কারণ তাদের আকিদা-বিশ্বাস হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু, হযরত ওমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং হযরত উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু সাহাবী নয় এবং তারা সকলেই জাহান্নামী। বরং হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু সর্বশ্রেষ্ঠ এবং তিনি রাসুল হওয়ার উপযুক্ত। হযরত জিবরাইল আলাইহিস সালাম ভুল করে তার উপর ওহী নাজিল না করে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর উপর নাজিল করেছে। তাদের যুক্তি মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) হিজরতের সময় হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুকে আমানতদার মনে করে আমানতদারদের নিকট আমানতের মাল পৌছে দেওয়ার জন্য তাঁকে দায়িত্ব প্রদান বারলেন। সিদ্দিকে আকবর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে দায়িত্বে দিলেন না। এতে প্রমানিত হয় যে, আলাই সর্বশ্রেষ্ঠ। তাদের এ যুক্তির উত্তর হলো, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর আমানত আর মক্কার লোকদের গচ্ছিত মাল হুজুর সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামের আমানত। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আমানতের চেয়ে আল্লাহর আমানত অনেক বড়।

আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে বৈচিত্রতা নিহিত আছে |

সিদ্দিকে আকবর রাদিয়াল্লাহু আনহু আল্লাহর আমানতকে আপন কোলে নিয়ে হেফাজত করেছেন। আর হযরত আলী বাদিয়াল্লাহু আনহু রাসুল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামের আমানতকে পৌছে দেয়ার দায়িত্ব পেয়েছেন। দ্বিতীয়ত: হযরত আলী বাদিয়াল্লাহ আনহু হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিছানা পেয়েছেন আর চুর পর্বতের গুহায় সিদ্দিকে আকবর বাদিয়াল্লাহু আনহু আপন কোলকে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য বিছানা বানিয়েছেন। অর্থাৎ হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু হুজুর সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বিছান। নিয়েছেন। সিদ্দিকে আকবর রাদিয়াল্লাহু আনহু হুজুর সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিছানা দিয়েছেন। উপরন্ত হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু হুজুর সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে নিয়েছেন অর্থাৎ ফাতেমা বাদিয়াল্লাহু আনহাকে বিয়ে করেছেন। আর সিদ্দিকে আকবর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর মেয়েকে (হযরত আয়েশা বাদিয়াল্লাহু আনহা) হুজুর সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট বিবাহ দিয়েছেন। এখন বলুন দাতা বড় না গ্রহীতা বড়? সুতরাং সিদ্দিকে আকবর রাদিয়াল্লাহু আনহুর উপর কাউকে শ্রেষ্ঠ মনে করা এবং কাউকে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করা যুক্তি সংগত নয়। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আক্বিদা-বিশ্বাস অনুযায়ী আল্লাহর পর হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্থান। তাঁর পর সিদ্দিকে আকবর রাদিয়াল্লাহ আনছর স্থান। সিদ্দিকে আকবর রাদিয়াল্লাহু আনহুর শানে কবি বলেন,

دنیا کے صداقت میں تیر انام رہیگا

صدیق تیری نام سے اسلام رہیگا۔

অর্থ: দুনিয়াতে সত্যবাদীদের আপনার নাম স্মরণীয় হয়ে থাকবে। সিদ্দীক আপনার নামের বরকতে ইসলাম জিন্দা থাকবে।


প্রাসঙ্গিক দু'টি কথা:


হক ও বাতিলের দ্বন্দ আবহমান কাল থেকে চলে আসছে। কিয়ামত পর্যন্ত চলবে। ইসলাম হক, অমুসলিমরা বাতিল। তবে সমাজের কিছু শিক্ষিত মুসলমান যারা ইসলামী নাম ধারন করে নিজেদেরকে মুসলমান দাবী করে এবং মুসলমানের সমাজে বসবাস করে তারা ইসলামের বিরোধিতা কেন করে? হয়ত তারা বিজাতীয় শিক্ষা-দীক্ষা গ্রহণ করে অথবা জাগতিক স্বার্থে তাদের মনোরঞ্জনের জন্য ইসলামের বিরোধিতা করে। কিংবা জন্মের পর তাদের এক কানে আজান অপর কানে ইকামত দেয়া হয়নি। নবজাত শিশুর এক কানে আজান অপর কানে ইকামত দেয়া রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত। এর মধ্যে দুইটি ফায়দা নিহিত রয়েছে। এক. নবজাত শিশুদের কানে আজান ও ইকামত, (যার মধ্যে আল্লাহ ও রাসুলের নাম রয়েছে) তাদের আত্মার প্রবেশ করার কারণে বিজাতীয় শিক্ষা গ্রহণ করে ইসলামের রীতি-নীতি পালন না করলেও সে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধাচারণ করবে না।

 দুই, হাবিবের এ সুন্নাত মানবজাতিকে সংকেত দিচ্ছে যে, আখেরাতের হায়াতের তুলনায় দুনিয়ার হায়াত অতি নগন্য। অর্থাৎ আজান ও ইকামতের মাঝে যে সময়টুকু থাকে এটাই তোমাদের হায়াত। মুয়াজ্জিন আজান দেওয়ার পর মুসল্লিগণ যাবতীয় কাজকর্ম ছেড়ে দিয়ে অজু করে নামাজ আদায়ের জন্য মসজিদের দিকে রওয়ানা হয়। অনুরূপভাবে দুনিয়াতে আসার পর তোমাদেরও আখেরাতের প্রস্তুতি গ্রহণ করা জরুরী।


তাগুতি শিক্ষা-দীক্ষা প্রদান করে ঈমানহারা ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর জন্য যুক্তি দিয়ে অতি কৌশলে ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। তা হলো বিদ্যা-বুদ্ধি, কান্ডজ্ঞানে পূর্বেকার সমাজের মানুষ ছিল নির্বোধ, অজ্ঞ। যে কারণে সন্তান প্রসব হতো বাড়িতে। এতে মায়ের রক্তক্ষরণ বেশি হতো। মায়ের শরীর দুর্বল হয়ে যেত। নবজাত শিশু পর্যাপ্ত পরিমান খাদ্য (দুধ) না গেয়ে তাদের স্বাস্থ্যও সবল হতো না। সুতরাং বাড়িতে সন্তান প্রসব না করিয়ে হাসপাতাল-ক্লিনিকে করলে রক্তরক্ষণ কম হবে। মা ও সন্তানের স্বাস্থ্য ভালো থাকবে। তাদের সুন্দর যুক্তি মুসলমানরা গ্রহণ করে সন্তান প্রসবের পূর্বে গর্ভবতী মাকে হাসপাতাল-ক্লিনিকে নিয়ে যায়। অথচ সেখানে সন্তান জন্মের পর আজান-ইকামত দেওয়ার কোন ব্যবস্থা নেই। উপরুন্ত হাসপাতাল-ক্লিনিকে পর্দার ব্যবস্থা নেই। খারাপ লোকদের আনাগোনাও কম নয়। এমতাবস্থায় সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ায় তার দৃষ্টি তাদের প্রতি পড়ার কারণে পরিনত বয়সে ঐ সন্তান বেপর্দা ও খারাপ কর্মকান্ডের দিকে ঝুঁকে পড়া স্বাভাবিক। তাগুতি শক্তির এ যুক্তিতে কতিপয় মুসলমান নামধারী ব্যক্তি রাসুল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত থেকে সরে যাওয়ার কারণে ইসলাম ও মুসলমানের বিরুদ্ধাচারণ করে। দ্বিতীয় বিষয়: ইসলাম বিরোধী শক্তিও তাদের তল্পীবাহকরা মাদরাসার বিরুদ্ধে সেভাবে প্রকাশ্যে বিরোধিতা করে এবং বলে মাদরাসা জঙ্গি আবিষ্কারের কারখানা। মাদরাসায় যারা পড়াশুনা করে, তারা সমাজের শান্তি-শৃংখলা বিঘ্নকারী। এর বিপরীতে নবী-রাসুল, কুরআন, মসজিদ এবং ইসলামের যাবতীয় কর্মকান্ডের বিরোধিতা সরাসরি করে না। এর কারণ


হলো, মাদরাসায় ইলম শিক্ষা দেওয়া হয়। ইলম ছাড়া ইসলামের কোন কাজই সঠিকভাবে আদায় করা সম্ভব নয়। ইলম হলো সব আমলের মূল শিকড়। যে কোন কলা কৌশলে মাদরাসা যদি ধ্বংস করা যায়, তাহলে ইসলামের যাবতীয় আমল এমনিতেই ধ্বংস হয়ে যাবে। যেমন গাছের ডালপালা, ফলমূল ইত্যাদিকে ধ্বংস করার জন্য যদি শিকড় কেটে দেওয়া হয়, তাহলে অন্য কিছু করার প্রয়োজন হবে না। তাই তারা সরাসরি মাদরাসার উপর আঘাত করে। আল্লাহ আমাদেরকে উভয় প্রকারের আমানতকে হেফাজত এবং তাগুতি শক্তির মুকাবিলা করার তাওফিক দান করুন। আমিন।


আই আবদুল হক আজাদ সাহেব সিনিয়র মুহাদ্দিস, জামিল মাদরাসা, বগুড়া সভাপতি, সম্মেলন সংস্থা, বগুড়া